শুক্রবার, ২১ জুন ২০২৪, ০৭:৪৫ পূর্বাহ্ন
সদ্যপ্রাপ্ত খবর :
অটিস্টিক শিশুদের আবাসন ও কর্মসংস্থান করবে সরকার   ||   নারীর প্রতি যৌন ও পারিবারিক সহিংসতা ক্রমাগতই বাড়ছে   ||   শান্তিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের নব-নির্বাচিত সভাপতি হলেন মৃত্যুঞ্জয়ী ছাত্রনেতা ছদরুল ইসলাম  ||

চোয়াল ব্যথার ঘটনা সত্য নয়

মোকাম্মেল হোসেন / ২০৬ বার পঠিত:
আপডেট সময় : শুক্রবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২২
চোয়াল ব্যথার ঘটনা সত্য নয়

অফিসে পৌঁছেই পিয়ন হাম্বর আলীকে বাইরে পাঠালেন শরবতি বেগম। বললেন, এক বাটি চিকেন স্যুপ আনতে। সঙ্গে ব্যথানাশক ট্যাবলেট। হাম্বর আলী অফিস থেকে বের হওয়ার ঠিক সাড়ে তিন মিনিটের মাথায় ম্যানেজার নীলাম্বর শাহ উদ্ভ্রান্তের মতো শরবতি বেগমের কক্ষে প্রবেশ করে বললেন,
: আপা, শুনলাম আপনার দাঁতের ব্যথা!
: হ্যাঁ। আজ সকাল থেকে…
: সকাল থেকে? ওহ্ গড!
: আপনার আবার কী হলো?
: ভোরে ঘুম থেকে উঠেই দেখি, আমার চোয়াল ব্যথা করছে। ব্যাপারটা তখন বুঝতে না পারলেও এখন বুঝতে পারছি আপা, হঠাৎ কেন আমার চোয়াল ব্যথা করছিল!

চোয়াল ব্যথার ঘটনা সত্য নয়। হাম্বর আলীকে অফিসের বাইরে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস না করলে বসের দন্তশূলজাতীয় শারীরিক অসুবিধার কথা জানতেই পারতেন না নীলাম্বর শাহ। উপরওয়ালার দাঁত ব্যথা শুরু হওয়ার আগেই যদি অধস্তনের চোয়ালে ব্যথা শুরু হয়ে যায়, তাহলে উপরওয়ালার খুশি হওয়ারই কথা। শরবতি বেগম খুশি হলেন। নীলাম্বর শাহ এটাই চান। তিনি চান শরবতি বেগমের নেকনজর সবসময় তার ওপর থাকুক। নেকনজরের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য দিনকে রাত, আগুনকে পানি, পাহাড়কে সমতল ভূমি বানাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না নীলাম্বর শাহ। শরবতি বেগমের কক্ষ থেকে বের হয়েই হাম্বর আলীকে ডাকলেন তিনি। তারপর পকেট থেকে নতুন একটা একশ টাকার নোট বের করে তার হাতে দিয়ে খোশমেজাজে বললেন,
: নেও। এইটা হইল তথ্য গোপন না করার বখশিশ! তথ্যপ্রবাহ যদি অবাধ রাখতে সক্ষম হও, তাহলে বখশিশও ননস্টপভাবে পাইতেই থাকবা…

এ ঘটনার কয়েকদিন পর নিউমার্কেট যাওয়ার আগে হাম্বর আলী বসের নতুন একটা চশমা ডেলিভারির তথ্য নীলাম্বর শাহকে দিয়ে গেল। নীলাম্বর শাহ তক্কেতক্কেই ছিলেন। হাম্বর আলী নিউমার্কেট থেকে ফেরার কিছুক্ষণ বাদে তিনি শরবতি বেগমের কক্ষে প্রবেশ করে বললেন,
: আপনার নতুন ফ্রেম আপা! ওফ, একেই বলে মনি-কাঞ্চন যোগ। যেমন আপনার মুখের গড়ন, তেমনি হয়েছে চশমার ফ্রেম; অপরূপ সমন্বয়।
: কিন্তু…
: আমি জানি আপা, আপনি কী বলবেন! আপনি বলবেন, একথা বলে কেন আপনাকে লজ্জা দিচ্ছি, এই তো?
: নীলাম্বর সাহেব!
: জি আপা।
: লজ্জা আমি সত্যি সত্যি পাচ্ছি; কিন্তু এই লজ্জাটা আসলে পাওয়া উচিত আপনার।
: আমার?
: হ্যাঁ, আপনার।
: কেন আপা?
: এজন্য যে, আমার চশমার এই ফ্রেমটা নতুন নয়; প্রায় তিন বছর ধরে এটি পরছি আমি।
: কিন্তু আপা, হাম্বর আলী যে নিউমার্কেট থেকে আপনার জন্য নতুন চশমা নিয়ে এলো?
: হাম্বর আলী নিউমার্কেট থেকে নতুন চশমা নিয়ে এসেছে ঠিকই; কিন্তু সেটি এখনও আমি চোখে পরিনি, ড্রয়ারে রেখে দিয়েছি; দেখবেন?

: না আপা, তার আর দরকার নেই। পুরাতনটা দেখেই মন ভরে গেছে আমার। তবে আপা, আপনার কাছে আমার একটা হাম্বল রিকোয়েস্ট আছে।
: কী?
: পুরাতন এই চশমাটা ডাস্টবিনে ফেলে না দিয়ে আমাকে দেবেন। আমি এটাকে দুষ্প্রাপ্য বস্তু হিসেবে সংরক্ষণ করব।
কিছুক্ষণ আগে নীলাম্বর শাহের ওপর চটে গেলেও বাতিল হয়ে যাওয়া চশমাকে এন্টিকস হিসেবে রেখে দেওয়ার কথা শুনে খুশি হলেন শরবতি বেগম। বললেন,
: তুচ্ছ জিনিসপত্র নিয়ে আপনারা যদি এমন…
: আপা! আপনি এটাকে তুচ্ছ বলছেন? আপনি কি জানেন, কোনো জিনিসের প্রতি আপনি তাকানো মাত্রই সেটি সোনা হয়ে যায়। এক্ষেত্রে এই চশমা ক্রমাগত তিন বছর ধরে আপনার সান্নিধ্য পেয়েছে। এটা যে কী হয়েছে; বিশ্বাস করুন, প্রয়োগ করার মতো কোনো শব্দ এই মুহূর্তে আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
শরবতি বেগম মহাখুশি। সঠিক মূল্যায়ন নেই বলেই বাঙালি জাতির আজ এই দুরবস্থা। এদিক থেকে নীলাম্বর শাহের মধ্যে কোনোরকম কূপমণ্ডুকতা নেই। ভদ্রলোক যা সত্য, তা বলতে মোটেই কার্পণ্য করেন না। এটি নীলাম্বর শাহের একটি মস্তবড় গুণ মনে করে শরবতি বেগম ভাবলেন, নীলাম্বর শাহের এই গুণের আগরবাতিতে আগুন জ্বালিয়ে তার ধোঁয়া সারা বাংলায় ছড়িয়ে দেওয়া দরকার, যা বাঙালির নাক-মুখ-কর্ণ গহ্বর দিয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করে তাদের পরিশুদ্ধ করে তোলার পর তারা উদার ও মহৎ হয়ে উঠবে। এর ফলে তাদের সমালোচনা করার বাজে অভ্যাস দূর হবে।

আগরবাতির ধোঁয়া ডিজিটাল পদ্ধতিতে একযোগে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারলে খুবই ভালো হবে। তাহলে বাদ পড়ার অভিযোগ উত্থাপন করতে পারবে না কেউ। শরবতি বেগম নীলাম্বর শাহকে চা অফার করলেন। চা পানরত অবস্থায় যতটা সম্ভব মুখটাকে মলিন করে নীলাম্বর শাহ বললেন,
: আপা, আপনার সঙ্গে চা পান করার সুযোগ পেয়েছি; এটা যে আমার কতবড় একটা সৌভাগ্য, তা বলে বুঝাতে পারব না। কিন্তু এত খুশির মধ্যেও মনটা বিষাদগ্রস্ত হয়ে আছে।
: কেন, কেন! কেন বিষাদগ্রস্ত আপনার মন?
: না-না। কার কথা বলব, কে আবার বেজার হবে? দরকার কী আপা! তার চেয়ে মচকে যাওয়া হৃদয় নিয়ে কষ্ট যা ভোগ করার, আমিই করতে থাকি…
: আহা, বলুন না!
: কিছু মনে করবেন না আপা; আপনি এত পরিশ্রম করেন, এত খাটাখাটনি করেন, বলতে গেলে এই অফিসের উন্নতির জন্য আপনি নিজের শরীরের রক্ত পানি করে ফেলছেন; অথচ তারপরও অফিসের কিছু বদলোক আপনার দুর্নাম করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। ওদের এই হারামিপনা দেখে আমি এতটাই মর্মাহত হই, কী বলব আপা!
: কারা আমার দুর্নাম করে?
: কয়জনের নাম বলব!
: ঠিক আছে, মুখে বলার দরকার নেই। আপনি আমাকে একটা লিস্ট দেন। লিস্ট অনুযায়ী অ্যাকশন হবে।

আধাঘণ্টার মধ্যে লিস্ট তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজের কক্ষে ফিরতেই নীলাম্বর শাহ দেখলেন, সহকর্মী-কাম-বন্ধু আফতাব সাহেব বসে আছেন। টেবিলের ওপর রাখা পেপারওয়েট হাতের মুঠোয় নিয়ে আফতাব সাহেব নীলাম্বর শাহকে বললেন,
: কী মিয়া, কাজকাম বাদ দিয়া সারাক্ষণ শুধু তেলের ওপর থাক…
: তেলের ওপর থাকা কি খারাপ?
: অবশ্যই খারাপ। এর ফলে অফিসের বারোটা বাজতেছে।
বারোটা বাজার কথা শুনে নীলাম্বর শাহ দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালেন। তারপর আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে আফতাব সাহেবকে বললেন,
: দোস্ত! বারোটা এখনও বাজে নাই; পাঁচ মিনিট বাকি আছে…

লেখক : সাংবাদিক, রম্যলেখক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই রকম আরো সংবাদ